শিক্ষা

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার।

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশে অনেক  ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে যেসকল স্থান দ্বারা সে তার সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।এইসকল স্থান অনেক বছরের পুরানো।বিভিন্ন রাজাদের মাধ্যমে এগুলো ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করেছে।  এইরকম একটি স্থানের নাম হল ” পাহাড়পুর ” । 

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার।


বৌদ্ধ যুগে রাজশাহী জেলায় বৌদ্ধদের যে আশ্রম নির্মিত হয়েছিল তা একটা সময় গিয়ে বিশাল ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে তাকে আমরা পাহাড়পুর নামে চিনি।অনেকবছর ধরে ধুলা বালি জমে গিয়ে একটি বড় ডিবির মত স্তুপ তৈরি হয়ে যায়। অনুমান করা হয়৭৮১-৮২১ সময়কালে রাজা ধর্মপালের শাসনামলে নির্মান করা হয়।এটিকে মুলত বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে ধরা যায়।আর তখন থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার শুরু হতে থাকে বলে মনে করা হয়। এটি  বাংলাদেশের একটি দর্শনীয় স্থান।


কথিত আছে,পালরাজা ধর্মপাল একাই ৫০ টি  বৌদ্ধবিহার নির্মান করেছিলেন।পরবর্তীতে এটি সোমপুর বিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এটিকে ইউনেস্কো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার হিসেবে স্বিকৃতী দিয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে,এটির পরিকল্পনা অনুসরণ করে ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার বৌদ্ধ স্থাপত্য নির্মাণ করেছে। তারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের সভ্যতাকে আরও উন্নত করে তুলেছে।   

 
পাহাড়পুর মূলত একটি বিহার।বাংলাদেশে অবস্থিত  বিহারগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় বিহার। এটি হিমালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত।এ বিহারটি উত্তর- দক্ষিণে ৯২২ ফুট ও পূর্ব – পশ্চিমে ৯১৯ ফুট।বিহারটি দেখতে চারকোনা। ধারণা করা হয়, এই বিহারের ভিতরে যে কক্ষগুলো আছে একসময় এগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিজেদের ধর্মচর্চায় ব্যাস্ত থাকত।এখানে ১৭৭ টি ভিক্ষু কক্ষ ছিল।  বিহারে একসময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাস করত প্রায় ১৪ শ বছর আগে। সেসব ভিক্ষুরা সেখানে ধর্মচর্চা করত ও তাদের নতুন শিষ্যদের শিক্ষা দিত। পরবর্তীকালে এটি বেশ কিছুকাল খালি ছিল।  দীর্ঘকাল পরে ১৮৭৯ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম পুনরায় আবিষ্কার করেন এবং নাম দেন সোমপুর বিহার।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার।

এখানে মাটির সীলমোহরে কিছু লেখা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই বিহারটি পাল রাজা ধর্মপালের  আমলে নির্মিত।এখানে একটি বিশাল আশ্রম আছে। এই আশ্রমটি প্রায় ২২ একর জমির উপর নির্মান করা হয়েছে। এটি তিনটি স্তরে বিভক্ত ও ৬৩ টি মুর্তি আছে।মূর্তিগুলো প্রতিটি একই মাপের।এগুলো পাথরের তৈরি ভাস্কর্য ছিল।এগুলো এখন সংরক্ষিত আছে। 


এগুলো দেয়ালের গায়ে সাজানো আছে। এর বাইরের দেয়ালে অপূর্ব পোড়মাটির ফলকে ফুল-ফল,পাতা,পুতুল,মুর্তি ইত্যাদি আঁকা আছে। মূর্তিগুলোতে তখনকার সময়ের নারী পুরুষের ছবিকে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে।   উত্তর দিকে আছে মূল দরজা, পাশেই আছে বড় হলঘর ও তার পাশেই ছোট হলঘর।মূল দরজায় অনেক কারুকাজ করা আছে যা থেকে  তখনকার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়   সামনে বারান্দা,পুকুর,কূপ,স্নানঘাট,খাবার ঘর,গোসলখানা, শস্যাগার,শৌচাগার ইত্যাদি।এছাড়াও বিহারে খনন করে পুরাতন অনেক জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। এখানের বারান্দাগুলো ৯ ফুট চওড়।    এখানে একসাথে ৮০০ মানুষ বাস করতে পারত।এখানে একটি বাঁধানো ঘাট আছে যা সন্ধ্যাবতির ঘাট বলা হয়।   পাহাড়পুর প্রাচীন বাংলার গৌরবের একটি জ্বলন্ত প্রতীক।

 বিহারের মূর্তিগুলোতে ব্রাহ্মণ ধর্মের ছাপ লক্ষ্য করা যায়।এগুলোর উপরে অপূর্ব টেরাকোটার চিত্র ছিল। চিত্রগুলোতে ছিল তখনকার সময়ের লোকশিল্পের নানা রকম চিত্র। আবার কিছু কিছু টেরাকোটায় রামায়ণ ও মহাভারতের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে।আশ্রমের গায়ে যেসব চিত্র ফুটিয়ে তুলা হয়েছে তার মধ্যে এইসব টেরাকোটার চিত্রই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।পরবর্তীতে খনন করে পুরাতন ২০০০ টেরাকোটার  চিত্রের প্লেট পাওয়া গেছে।এইসব টেরাকোটা নিঃসন্দেহে প্রত্যেকের নজর কেড়ে নিবে।       


পাহাড়পুরের  মন্দির, বৌদ্ধ আশ্রম, আশ্রমের কিছুদূরের সত্যপীঠের ভিটা,প্লেটের উপর তাম্রলিপি দ্বারা নির্মিত মূর্তি এসব পুরাকির্তির নিদর্শন পাহাড়পুরকে আরও উন্নত করে তুলেছে।   বাংলাদেশে যে কয়টি স্থান আছে পাহাড়পুর হল তাদের মধ্যে অন্যতম।  এখানে ভ্রমণ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের মেধাকে  ধারালো করতে পারব।এসব আমাদের ঐতিহ্যকে উপভোগ করতেও সাহায্য কর।    


আমরা আমদের এইসব স্থান নিয়ে গর্বিত কারণ প্রমাণিত হয়েছে পাহাড়পুর বিশ্বের সুপ্রাচীন ও দুর্লভ স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম।  আমদের স্বীকার করতে হবে যে, পাহাড়পুর  হল অতি সুপ্রাচীন একটি নিদর্শন ও আমাদের গৌরব যখন বর্তমানের সভ্য দেশগুলো সভ্যতার আলো  এখনও দেখে নি। তাই আমদের পাহাড়পুর নিয়ে গর্ব করা উচিত।       

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button